নিজস্ব প্রতিবেদক :: এবার যেনো বন্যাই নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে সিলেটবাসীর। মাত্র ২ সপ্তাহের ব্যবধানে আবারো প্লাবিত গোটা সিলেট জেলা ও নগরী। সরকারি হিসেবে বন্যা কবলিত মানুষের সংখ্যা ৮ লাখ ছাড়িয়েছে। এর আগে গত ২৯ মে থেকে সিলেট জেলার ৭ উপজেলা ও ২ জুন থেকে সিলেট নগরীর ২৮টি ওয়ার্ড প্লাবিত হলে পানিবন্দী হয়ে পড়েন ৫ লক্ষাধিক মানুষ। প্রথমদফা বন্যার পানি নামতে না নামতেই ১৫ জুন থেকে দ্বিতীয় দফা বন্যায় আঘাত হানে। এ পর্যন্ত দ্বিতীয়দফা বন্যায় জেলা ও নগরে বন্যাকবলিতের সংখ্যা ৮ লাখ ছাড়িয়েছে। তবে বুধবার অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢল কম থাকায় নতুন এলাকা প্লাবিত হয় নি।
বুধবার বিকেলে সিলেট জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, এ সময় পর্যন্ত সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৩টি ওয়ার্ড ও জেলার ১০৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এতে ৮ লাখ ২৫ হাজার ২৫৬ জন মানুষ বন্যা আক্রান্ত। এর মধ্যে সিলেট নগরে পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা অধলক্ষাধিক।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ৬৫৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে নগরীতে ৮০টি। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ১৯ হাজার ৯৫৯ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে, বেশিরভাগ মানুষজন নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে পাড়া-প্রতিবেশিদের উঁচু বাসা-বাড়ি বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন।
বুধবা ও সরেজমিতে সিলেট নগরীর শাহজালাল উপশহর, যতরপুর, মেন্দিবাগ, শিবগঞ্জ, রায়নগর, সোবহানীঘাট, কালিঘাট, কামালগড়, মাছিমপুর, শেখঘাট, ঘাসিটুলা, তালতলা, জামতলা, বাগবাড়ি, কাজিরবাজার, মদিনা মার্কেট, আখালিয়া, মেজরটিলা ও দক্ষিণ সুরমার লাউয়াই, বরইকান্দি, আলমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেকের বাসাবাড়িতে কোমর পর্যন্ত পানি। নিচু এলাকাগুলোর কলোনি বা বাসা-বাড়ি প্রায় পুরোটাই তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। এতে চরম বিপাকে এসব এলাকার মানুষ। অনেকে গেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে, আবার অনেকে নিজের বাসা-বাড়ি ছেড়ে যেতে চাচ্ছেন না।
অপরদিকে, সিলেট সদর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুরসহ কয়েকটি উপজেলার প্রামীণ অনেক রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনেক কৃষিজমির ফসল তলিয়ে গেছে, ভেসে গেছে পুকুরের মাছ।
এদিকে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পানিবন্দী লোকদের উদ্ধারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তৎপরতা চালানো হচ্ছে। বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়গুলোতে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। বন্যার্তদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য ইউনিয়নভিত্তিক ১৬৮টি মেডিকেল টিম গঠন করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস জানান, বুধবার বিকোল ৩টায় সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ও সিলেট পয়েন্টে ৩৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো। এছাড়া কুশিয়ারা নদীর আমলসিদ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ৯৯ ও শেরপুর পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি বইছিল।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন জানান, ২৪ ঘন্টায় সিলেটে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী জানান, সিলেটে বন্যায় আক্রান্ত কোনো মানুষ যেনো কষ্ট না পান, তার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবারসহ ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের সকলের ছুটি বাতিল করে বন্যার্তদের জন্য সার্বক্ষনিক কাজ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বন্যায় পানিবন্দী বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফাঁকা পড়ে আছে। নদীতীরবর্তী বিভিন্ন গুদামে পানি প্রবেশ করায় মালামাল স্থানান্তর করেছেন ব্যবসায়ীরা। ভারত থেকে নেমে আসা উজানের পাহাড়ি ঢলের পানিতে আটকে পড়া বন্যাকবলিতদের উদ্ধার করছে উপজেলা প্রশাসন। পানিবন্দী মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে নেওয়া হচ্ছে রেসকিউ বোটে করে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেছেন, বিভিন্ন স্থানে পানিতে আটকে পড়া মানুষ জাতীয় জরুরী সেবা নাম্বারে ফোন দিলে, আমরা তাৎক্ষনিক রেসকিউ বোট দিয়ে তাদেও উদ্ধার করছি। শুধু মানুষজনই না, গবাদিপশু উদ্ধার করে নিরাপদস্থানে নিচ্ছি আমরা।
বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে প্রাণ গেলো বৃদ্ধের : সিলেটের জকিগঞ্জে বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে ¯্রােতে ভেসে আব্দুল হালিম (৫৫) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তিনি মুহিদপুর গ্রামের মৃত রনই মিয়ার ছেলে ও পেশায় পিকআপ চালক। বন্যার পানিতে সকাল ৯টা দিকে মাছ ধরতে যান আবদুল হালিম। প্রচন্ড ¯্রােতে তিনি নিখোঁজ হন। বেলা ২টার দিকে শাহবাগ মুহিদপুর এলাকায় তার লাশ ভেসে উঠে।
জকিগঞ্জ থানার এসআই মো মহরম আলী জানান, বন্যার পানিতে একজন নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে পুলিশের একটি ঘটনাস্থলে যায়। লাশ উদ্ধারের পর উর্ধ্বতন কর্মকতাদের অনুমতিসাপেক্ষে ময়না তদন্ত ছাড়া দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
Leave a Reply